শিক্ষার গুরুত্ব ও আধুনিক সমাজে শিক্ষার ভূমিকা
শিক্ষা মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ। মানুষ জন্মগতভাবে অসহায় হলেও শিক্ষার মাধ্যমে সে নিজেকে যোগ্য, আত্মনির্ভরশীল ও মানবিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। শিক্ষা শুধু বইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের চিন্তাধারা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও আচরণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি জাতির উন্নতি, অগ্রগতি ও সভ্যতার মাপকাঠি নির্ভর করে সেই জাতির শিক্ষার মানের উপর।
শিক্ষা মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোতে নিয়ে আসে। একজন অশিক্ষিত মানুষ সমাজে নিজের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে না। ফলে সে সহজেই প্রতারণা ও শোষণের শিকার হয়। অন্যদিকে একজন শিক্ষিত মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, যুক্তিবোধ দিয়ে চিন্তা করতে শেখে এবং সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পায়। শিক্ষা মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে।
আধুনিক সমাজে শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। বর্তমান বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষার বিকল্প নেই। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রকৌশল—সব ক্ষেত্রেই শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষের প্রয়োজন। একটি দেশ তখনই উন্নত হতে পারে, যখন সেই দেশের জনগণ শিক্ষিত ও দক্ষ হয়। তাই উন্নত দেশগুলো শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নই নয়, সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষিত মানুষ সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তারা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যেমন—বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতনের মতো সমস্যাগুলো দূর করতে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে নারী শিক্ষার মাধ্যমে একটি সমাজ আরও উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বলা হয়, “একজন নারী শিক্ষিত হলে একটি পরিবার শিক্ষিত হয়।”
নৈতিক শিক্ষা মানুষের চরিত্র গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা থাকলেই একজন মানুষ প্রকৃত শিক্ষিত হয় না। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিকতা ও সহানুভূতির মতো গুণাবলি শিক্ষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। একটি সমাজে যদি শিক্ষিত হলেও নৈতিকতার অভাব থাকে, তবে সেই সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে না। তাই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষাও অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যায় ঝুঁকে পড়ছে। আবার অনেক দরিদ্র ও গ্রামীণ এলাকায় এখনো মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নেই। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার ও সমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে। সবার জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষা ছাড়া ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, চিন্তাশীল করে এবং মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলে। একটি শিক্ষিত জাতিই পারে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উন্নত দেশ গড়ে তুলতে। তাই আমাদের সবার উচিত শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং শিক্ষার প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।
Leave a Comment